সৌম্য সরকার : এক হারিয়ে যাওয়া তারকার গল্প!

ক্রীড়া প্রতিবেদক: সালটা ২০১৪। বছরের যতো সিরিজ টুর্নামেন্ট আছে প্রায় সবগুলোতেই বাজেভাবে হেরে রীতিমতো খাদের কিনারায় বাংলাদেশ। ২০০৭ এর পর থেকে একটু একটু করে অঘটন জন্ম দিলেও ২০১৪ তে যেনো সবটাই শেষ হওয়ার পথে। শঙ্কা জাগে টেস্ট স্ট্যাটাস নিয়েও। সেটার সমাধান হলেও আনকোরা আফগানিস্তান হংকং এর সাথে হেরে আসন্ন জিম্বাবুয়ে সিরিজেও যেনো আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাচ্ছিলো না টিম বাংলাদেশ। তবে অবশেষে জিম্বাবুয়ে কে ৩ ম্যাচ টেস্টে হোয়াইটওয়াশ করে যেনো পায়ের তলায় মাটি ফিরে পায় বাংলাদেশ। শুরু হয় আগাম ওডিয়াই সিরিজ এবং বিশ্বকাপের পরিকল্পনা। মাশরাফির নেতৃত্বে জিম্বাবুয়েকে ওডিয়াইতেও ৫-০ ব্যাবধানে হোয়াইটওয়াশ করে বিশ্বকাপের আগে মোটামুটি একটা অবস্থান ফিরে পায় বাংলাদেশ। শুরু হয় বিশ্বকাপের দল নির্বাচন। ৫-৬ নাম্বারে ব্যাটিংয়ে নেমে সাড়া ফেলার কারণে সাব্বির রহমানের অন্তর্ভুক্তি সবাই ধরেই নিয়েছিলো। সাথে পেসার তাসকিন আহমেদও প্রত্যাশিতই ছিলো। তবে স্কোয়াডে বড় চমক সৌম্য সরকার। কে সে? জিম্বাবুয়ে সিরিজে মাত্র ১ ম্যাচে ২০ রানের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে??। আজব তো। কি আছে তার মাঝে।

সাতক্ষীরায় জন্ম নেওয়া এই বামহাতি স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান বিকেএসপিতে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন এবং ২০১০ ও ২০১২ তে অনুর্ধ-১৯ বিশ্বকাপ খেলেন। তবে তিনি আলোচনায় আসেন কোয়ার্টার ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যান জিমি পেয়ারসন কে মানকাড করে।

তিনি ২০১০-১১ মৌসুমে খুলনা বিভাগের হয়ে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলেন এবং ২০১৪ তে জিম্বাবুয়ে সিরিজের শেষ ম্যাচে তার ডেবিউ হয়।

বিশ্বকাপে তার অন্তর্ভুক্তির অন্যতম কারণ ছিলো তার স্টাইলিশ ব্যাটিং। বাঘা বাঘা পেস বোলারদেরও নিজের দিনে পাড়ার বলার বানিয়ে ফেলার একটা গুন তার মধ্যে ছিলো তাই অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনের বিশ্বকাপে তাকে নেয়া হয়।

মাত্র এক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপে সাবলীল ব্যাটিং করেন তিনি। ১ ফিফটি সহ ৫ ম্যাচে ১৭৫ রান করেন বিশ্বকাপে। আহামরি না হলেও তার ভয়ডরহীন ব্যাটিং এবং সিক্স হিটিং এবিলিটি সমর্থকদের মনে আশা জাগায়।

বিশ্বকাপের পরে ঘরের মাঠে ৩ মেগা সিরিজে পাকিস্তান ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে যেনো রীতিমতো ঝড় উঠে সৌম্যের ব্যাটে। পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজের মাত্র ১০ নাম্বার ম্যাচেই পেয়ে যান ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। চার ছক্কার ফুলঝুরি ছুটিয়ে পাকিস্তানকে হোয়াইট ওয়াশ এ বড় অবদান রাখেন তিনি।এরপর ভারত সিরিজেও সৌম্যের ব্যাট ছিলো চওড়া। ভুবনেশ্বর কুমার যাদবদের নিয়ে সাজানো পেস এটাক কে এতো সাচ্ছন্দ্য বাউন্ডারি ছাড়া করছেন বুঝার উপায় নেই এই ছেলের ক্যারিয়ার এখনো এক বছরও হয় নি।

তবে সৌম্য যেনো তাক লাগিয়ে দেন পরের সিরিজে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে যেখানে অভিষেকে কাগিসো রাবাদা ৬ উইকেট নিয়ে নিজের আগমনী বার্তা দিয়ে রেখেছিলেন। সেখানে পরের দুই ম্যাচে রাবাদা মর্কেল মরিসদের নিয়ে সাজানো পেস এটাক কে রীতিমতো তুলোধনা করে ২ ম্যাচেই খেলেন ৮৮ আর ৯০ রানের দুই ঝড়ো ইনিংস। ম্যান অফ দ্যা সিরিজও তিনি। এই তিন সিরিজের নয় ম্যাচে মোট ৪৯৭ রান করেন তিনি।

বিশ্ব অবাক বাঙালি ব্যাটসম্যানের এমন ব্যাটিংয়ে সমর্থকরা ধরেই নিয়েছেন আমরা পেয়ে গেছি আমাদের ব্যাটিং সেনসেশন। ভারতের যেমন কোহলি পাকিস্তানের বাবর আমরা পেয়ে গেছি আমাদের সৌম্য। কিন্তু তা আর হলো কই?

এমন দুর্দান্ত এক মৌসুমের পরেই যেনো ডাউনফল শুরু তার। আফগানিস্তান সিরিজে ফ্লপ। ফলস্বরুপ ইংল্যান্ড সিরিজে ডাকই পেলেন না। নিউজিল্যান্ড সিরিজে ফ্লপ পরবর্তী শ্রীলংকা সিরিজে ফ্লপ। আয়ারল্যান্ডে ট্রাই নেশন সিরিজে কিছুটা ফেরার ইঙ্গিত দিলেও ইংল্যান্ডে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি তে আবার ফ্লপ তাকে এক বছরের জন্য ছিটকে দেয় জাতীয় দল থেকে। ব্যাক করেন ২০১৮ এর এশিয়া কাপে তবে আবারও যা তা। আর ফিরতে পারেন নি সেই চেনা রুপে।

এরই মাঝে তার টেস্ট ডেবিউ হয় টি-টোয়েন্টি ডেবিউ হয় তবে কোনোটাতেই আর তেমন ভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারেন নি। এক ম্যাচ ভালো খেললেই পরের ম্যাচ ফ্লপ এটাই হয়ে যায় সৌম্যের নীতি।

মাঝে জিম্বাবুয়ের সাথে সেঞ্চুরি নিউজিল্যান্ডে গিয়ে টেস্টে ফিফটি সেঞ্চুরি শ্রীলংকার সাথে টি-টোয়েন্টি তে ফিফটি। এমন টুকটাক ইনিংস খেলেছেন মাঝে মধ্যে তবে সে আগুনে সৌম্য কে আর পাওয়া যায় নি।

তবে ফিরে আসার সবচেয়ে কাছে ছিলেন ২০১৯ এ। বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে ট্রাই সিরিজে ৩ ম্যাচে ৩ ফিফটি ও ইনিংসে যেনো আবার ধারাবাহিক রুপে ফিরে আসার বার্তা দেন। ফলস্বরুপ বিশ্বকাপে তাকে ঘিরে বড় আশা তৈরী হয়। তবে বিশ্বকাপে আবারও যেই সেই। প্রায় প্রতি ম্যাচেই ভালো শুরু করলেও বড় ইনিংস খেলাটা তার কাছে স্বপ্নই থেকে যায়।

তারপর ঘরের মাঠে বঙ্গবন্ধু বিপিএলে ব্যাট-বল হাতে মোটামুটি পারফর্ম করেন।ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি তে একটা ইউজফুল ইনিংস খেলেন। তবে সেই আগের টাচে যেনো ফিরতেই পারছেন না তিনি।

তার ডাউনফল এর কারণ হিসাবে অনেকেই বিভিন্ন কারণ দেখেন। ফুটওয়ার্কে প্রব্লেম ডিফেন্সে দুর্বলতা অতিরিক্ত শট খেলার প্রবণতাই তার ডাউনফল এর অন্যতম কারণ হিসাবে ধরা হয়।

শেষ নিউজিল্যান্ড সিরিজে হতাশ করলেও টি-টোয়েন্টিতে একটি দুরন্ত ফিফটির ইনিংস উপহার দেন।যা দেখে শুধু আফসোসই বাড়ে যে এই ফর্মটা যদি লাগাতার থাকতো।

শেষ শ্রীলংকার বিপক্ষে দলে থাকলেও ম্যাচ খেলার সুযোগ পান নি। চলমান ডিপিএলে মোটামুটি ধারাবাহিক ব্যাটিং করছেন। সামনে আসছে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড এবং ভারতের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। নিজেকে প্রমাণের এরচেয়ে বড় সুযোগ আর হয়তো পাবেন না তিনি।

তাই এতো এতো ব্যার্থতার পরেও সৌম্য ফ্যানদের আশা আবারও চেনারুপে ফিরবেন তিনি। একের পর এক নান্দনিক ড্রাইভ পুল শটে সিমানা ছাড়া করবেন স্টার্ক রাবাদা বোল্ট বুমরাহদের।

আপাতত এই আশায় বুক বেধে আছে হাজারো সৌম্য ভক্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *