ডা: মোছা: ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী
ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব যা বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। এই উৎসবের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে ত্যাগ, আত্মসংযম এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যে। সেই ত্যাগেরই জীবন্ত প্রতীক হলো কোরবানি, যা কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয় বরং আত্মশুদ্ধি ও মানবতার পাঠশালা। ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের পর সামর্থ্যবান মুসলমানরা নির্ধারিত নিয়মে পশু কোরবানি করে থাকেন। আর এই পশু কোরবানিকে কেন্দ্র করে দেশে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক গরু, ছাগল, ভেড়া ,কিছুক্ষেত্রে উট এমনকি দুম্বাও কেনাবেচা ও লালন-পালন করা হয়।
ক্রয় পরবর্তী সময়ে কোরবানি পশুর খাদ্য, চিকিৎসা ও পরিবহনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়ে থাকে। ঈদকে সামনে রেখে অনেকেই পশু কিনবেন বা অনেকেই পশু কিনে ফেলেছেন যে কারণে কোরবানির পশুর বাড়তি যত্ন প্রয়োজন।
হাট থেকে পশু কেনার পর প্রথম যে বিষয়টি গুরুত্ব পায় তা হলো পশু পরিবহন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অতিরিক্ত গাদাগাদি করে বা অমানবিকভাবে পশু পরিবহন করা হয়। এতে পশু আঘাতপ্রাপ্ত হয়, মানসিক চাপের শিকার হয় এবং অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়ে। একটি সভ্য সমাজে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পশুর প্রতি সহানুভূতি ও দায়িত্বশীলতা আমাদের নৈতিকতারই প্রতিফলন। পশু কেনা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসার দূরত্ব বেশি হলে পিকআপ ভ্যান বা অন্য কোনো পশু পরিবহনকারী বাহনে নিয়ে আসতে হবে। কোনোভাবেই পশুকে হেঁটে বা দৌড়ে আনা-নেওয়া করা যাবে না।
এছাড়াও হাটে ব্যবসায়ীরা গরু, ছাগলকে সাধারণত কম খাবার দিয়ে থাকে। এরপরে তাদেরকে দীর্ঘ পথ হেঁটে নিয়ে আসলে আরো দূর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। যার ফলে কোরবানির পশু অসুস্থ হতে পারে এমনকি মারাও যেতে পারে। এমতাবস্থায় পশু পরিবহনে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
এরপরেই আসে পশুর বাসস্থান। কোরবানির জন্য আনা পশুগুলো সাধারণত অল্প সময়ের জন্য ঘরে বা খামারে রাখা হয়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সুস্থতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বাসস্থান হতে হবে পরিষ্কার, প্রশস্ত ও আরামদায়ক। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংকীর্ণ ও অপরিচ্ছন্ন জায়গায় পশু বেঁধে রাখা হয় যেখানে পর্যাপ্ত আলো বা বাতাস প্রবেশ করে না। এতে পশু মানসিক চাপের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। তাই পশুর থাকার জায়গাটি শুষ্ক ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে। প্রথম দিনে গরুকে নিয়ে এসে আলো-বাতাসযুক্ত ঘরে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখতে হবে।
পশুর শরীরে অনেক ধকল থাকায় প্রথম দিনে সাধারণত খাবারে অরুচি থাকে। এসময় পশুকে খাবারের ব্যাপারে জোড়াজুড়ি না করে তাদের সামনে পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি রাখতে হবে। খাবার হিসেবে খড়, কাচা ঘাস, ভুসি কিংবা ভাতের মাড় রাখা যেতে পারে। পশুকে ওজনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রেডি ফিড খাওয়ানো যেতে পারে। ভেড়া বা ছাগলের জন্য গাছের পাতা,ঘাস এবং পানির সাথে অল্প পরিমাণ ভুসি মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার অবশ্যই পরিহার করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় পশু কেনার সময় খামারি বা বিক্রেতার কাছে খাদ্যাভ্যাস জেনে নেওয়া।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোরবানির আগে পশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খাওয়ানো। পানি পান করালে পশুর শরীর হাইড্রেটেড থাকে। দীর্ঘ সময় পরিবহন বা হাটে থাকার কারণে অনেক পশু পানিশূন্যতায় ভোগে। এতে তারা দূর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত পানি তাদের শরীরকে সতেজ রাখে এবং স্বাভাবিক শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও পানি হজম প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। কোরবানির আগে অনেক সময় পশুকে নতুন পরিবেশে রাখা হয়,খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হয়। এ অবস্থায় পানি অন্ত্রের কার্যকারিতা ঠিক রাখে এবং হজমজনিত সমস্যা কমায়।
অতিরিক্ত গরমের সময় পশুর প্রতি সতর্ক নজর রাখতে হবে। এই সময়ে কোরবানির পশুকে যথেষ্ট পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে যেন হিট স্ট্রোক না করে। শরীর অপরিষ্কার থাকলে শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করানো ভালো। গরু-ছাগলের শরীরে প্রতিদিন ধুলাবালি,গোবরের গন্ধ ও ময়লা জমে। সাধারণ পানিতে গোসল করালে সব ময়লা পরিষ্কার হয় না। শ্যাম্পু ব্যবহার করলে ত্বক ও লোমের গভীরে থাকা ময়লা দূর হয় এবং শরীর বেশি সতেজ ও পরিচ্ছন্ন থাকে।
চেষ্টা করতে হবে কোরবানির পশুকে স্বাভাবিক খোলামেলা পরিবেশে রাখার। দিনে অন্তত ১০-১৫ মিনিট হাঁটার ব্যবস্থা রাখলে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকে। এছাড়াও প্রতিদিন পশুর মলমূত্র ও উচ্ছিষ্ট খাবার পরিষ্কার রাখতে হবে। পরিবেশ যেন দূষিত না হয় বা মশা-মাছির উপদ্রব না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ঈদের দিন জামাতে যাওয়ার আগে সকাল সকাল গরুকে গোসল করানো যেতে পারে যাতে শরীরে লেগে থাকা ময়লা, গোবর ইত্যাদি পরিষ্কার হয়ে যায়। এছড়াও গোসল করালে গরু হালকা ও সতেজ অনুভব করে, গরমে আরাম পায় এবং মানসিকভাবে কিছুটা শান্ত থাকে। এমনকি পরিষ্কার পশুর জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর সময় কাজ সহজ হয় এবং হাইজিন বজায় থাকে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭ টি কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪ টি পশু কোরবানি হয়েছে যা ২০২৪ সালে ছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮। চলতি বছরে দেশে কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। আর কোরবানি হতে পারে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ টি পশু ( মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর তথ্যমতে)। এই বিপুল সংখ্যক কোরবানিযোগ্য পশু আমাদের অর্থনীতি, প্রামীণ জীবিকা ও ধর্মীয় অনুশীলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই এসব পশুর যথাযথ যত্ন,পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চতকরণ এবং সুস্থ পরিবেশে লালন-পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কোরবানির সময় পশুর প্রতি মানবিক আচরণ, অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এড়ানো এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে জবাই করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
সবমিলিয়ে পশুর প্রতি দয়া ও সহানুভূতিশীল আচরণ করা কেবল নৈতিকতার দাবি নয় বরং ইসলামী শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোরবানির পশুর প্রতি যত্ন একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল কাজ। এই যত্নই কোরবানিকে করে তোলে আরও পবিত্র,সুন্দর ও অর্থবহ।
