অযৌক্তিক ভালোবাসা : ইসমাঈল হোসেন

অযৌক্তিক ভালোবাসা : ইসমাঈল হোসেন

১৮ জানুয়ারী সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে গত ৪ দিন ধরে একটা গন্ডীতে আবদ্ধ হয়ে আছি। ডাক্তার চিকিৎসা দিয়েছেন, তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে সহযোগিতা করেছেন, ঘরের মানুষ সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে বিরাট ঝুঁকি থেকে বেঁচে সুস্থতার পথে আছি এখন। এ সবের মাঝে আর যা ঘটলো তা হলো প্রতিদিন অনেক মানুষের দেখতে আসা। একজন অসুস্থ মানুষকে যাঁরা দেখতে আসেন তাঁরা শুধু দেখেই যান। এটা চিকিৎসা বা সেবা কোনটাতেই পড়ে না। দেখে গেলে রোগ ভালো হয়ে যায় না বা রোগী সুস্থ হয়েও যায় না। তাই এই দেখতে আসাটা হয়তো অযৌক্তিক বা অপ্রয়োজন। আমি এই অযৌক্তিক কাজটার নাম দিয়েছি ‘ভালোবাসা’। হ্যাঁ, ভালোবাসা কখনো যুক্তির পথ ধরে চলে না। বরং যুক্তি থাকলে সেখানে ভালোবাসা থাকে কিনা সেটাই সন্দেহ। পৃথিবীর সব কাজ যুক্তি দিয়ে চলে, শুধু ভালোবাসা চলে হৃদয় দিয়ে। পৃথিবীর সব কাজই উদ্দেশ্যমূলক, শুধু ভালোবাসা ছাড়া। ভালোবাসায় কোন উদ্দেশ্য বা কারণ থাকতে পারে না। আপনি যদি ভালোবাসার পেছনে কোন কারণ খুঁজে পান, তাহলে ধরে নিবেন আপনি আসলে ভালোই বাসেন না। কোন কারণ হয়তো ভালোবাসা সৃষ্টির সহায়ক হতে পারে বা সে পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তখন শুধু কারণটাই থাকে, ভালোবাসা থাকে না। যখন ভালোবাসা হয়ে যায় তখন আর কারণটা থাকে না।

একজনকে খুব মেধাবী জেনে কেউ তার সাথে মিশলো এবং শুধু মেধার কারণেই তাকে ভালোবাসতে শুরু করলো। একদিন প্রমাণিত হলো তার জানাটা ভুল, যাকে ভালোবাসে সে আসলে তেমন মেধাবী নয়। তারপর তার কাছে মনে হলো সে প্রতারিত হয়েছে। ব্যাস, নিমিষে সিদ্ধান্ত পাল্টে গেলো। ভালোবাসা নষ্ট হয়ে গেলো। আসলে এখানে ভালোই বাসা হয়নি, তাই নষ্টও কিছু হয়নি। আপনি একজনকে খুব সুন্দর বলে ভালোবাসলেন এবং শুধু এ কারণেই ভালোবেসে যেতে লাগলেন। যদি কোনদিন কোন কারণে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আপনি নিশ্চিত ফিরে আসবেন। কারণ আপনি মানুষটাকে ভালোবাসেননি। এ উদাহরণ অনেক কিছু দিয়েই দেয়া যায়। ভালোবাসার কত শক্তি বা ভালোবাসা কতটা খাঁটি হয় তা তখনি অনুভব করা যায়, যখন সব কারণ ও যুক্তি বাদ দিয়ে শুধু মানুষটাকে ভালোবাসা যায়।

ভালোবাসার মাত্রা থাকতে পারে, রকমফের থাকতে পারে। কিন্তু সব ভালোবাসারই মূল নিয়ামক হওয়া উচিত মানুষ। তার মেধা, রূপ/সৌন্দর্য, সম্পদ কোনটাই মূখ্য হওয়া উচিত না, মানুষটাই মূখ্য হওয়া উচিত। মানুষ আমাকে দেখতে এসেছে শুধু আমাকে প্রাধান্য দিয়েই। কোন কারণকে প্রাধান্য দিয়ে নয়। তাই নিজের সময় নষ্ট করে যারা আমাকে দেখতে এসে সহমর্মিতা ও সহানুভূতি দেখিয়েছেন তাদের সবার নিকট এবং যে আমাকে ঐ কঠিন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন তাঁর নিকট আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো না, ভালোবাসা-ই প্রকাশ করবো।

এ ধরণের ঘটনায় ডাক্তার ও নার্স চিকিৎসা ও সেবা দিয়ে থাকেন। সেখানে হয়তো ভালোবাসা থাকে না বা থাকে কিনা সে প্রশ্ন থাকে না। কিন্তু আমি যাঁর চিকিৎসা পেয়েছি এবং যাঁদের সেবা পেয়েছি তাঁরা সবাই এ কাজটা শুধু ভালোবেসে করেছেন, শুধুই ভালোবেসে। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও যত্ন দিয়েছেন এবং বিনিময়ে একটি কানাকড়িও নেননি। এ রকম রোগী হওয়া হয়তো সবার হয় না। তাঁদের প্রতিও আমি শুধুই ভালোবাসা প্রকাশ করতে চাই।

মানুষ এতটা ভালোবাসে জানতাম না। কোন ভালোবাসারই প্রতিদান দেয়া যায় না, বিনিময়ে শুধু ভালোবাসা যায়। ভালোবাসা পেতে যোগ্যতা লাগে না, কিন্তু ভালোবেসে যেতে হৃদয়ের বিশালতা লাগে। সে বিশালতা হয়তো আমার নেই। তবু সবার ভালোবাসার প্রতিদানে শুধু ভালোই বেসে যেতে চাই।

লেখক: ইসমাঈল হোসেন, শিক্ষক ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ।
লেখক: ইসমাঈল হোসেন, শিক্ষক ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ।

Related posts