কুমিল্লা-৯; প্রার্থী নিয়ে স্বস্তিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপিতে প্রার্থীর ছড়াছড়ি!

কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি, সোনালী দেশ ডটকম::

জেলার লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে কুমিল্লা-৯ আসনে নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়ে গেছে। শাসক দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির প্রার্থীরা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা স্থানীয় নানা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন। নতুনসহ প্রবীণ রাজনীতিকদের ছবি সংবলিত পোস্টারে ছেয়ে গেছে নির্বাচনী এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সব মোড়। প্রচারে কাজে লাগাচ্ছেন আধুনিক প্রযুক্তি মোবাইল ফোনে এসএমএস ও ফেসবুক।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং দীর্ঘসময় পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসনটি আওয়ামী লীগ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি তাজুল ইসলামের হাত ধরে আসনটি ফিরে পায় শাসক দল আওয়ামী লীগ। এছাড়া ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনেও বিজয়ী হন লাকসাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তাজুল ইসলাম। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের শক্ত প্রার্থী। তবে নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম নির্বাচনে আসনটি দখলে নেয় বিএনপি। ১৯৯১ সালের ওই নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির এটিএম আলমগীর এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিম। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে চাইলেও বিএনপির চাচ্ছে তাদের হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে।

আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী বর্তমান এমপি ও লাকসাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম দৃশ্যত একক প্রার্থী হওয়ায় তার মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত। এরই মধ্যে তিনি মাঠে নেমে পড়েছেন। প্রার্থী নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে বিএনপি। কেননা বিএনপির একাধিক প্রার্থী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিম, কেন্দ্রীয় কমিটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম, যুবদল কেন্দ্রীয় সংসদের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ড. রশিদ আহম্মদ হোসাইনী, লাকসাম উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মজির আহমেদ, মনোহরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপির সভাপতি শিল্পপতি ইলিয়াছ পাটোয়ারী, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক দফতর সম্পাদক সফিকুর রহমান সফিক এবং জাতীয় পার্টির অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা এবং অধ্যাপক আবদুল খালেক দুলাল। তবে আওয়ামী লীগে অনেকের নাম শোনা গেলেও তারা কেউ মাঠে নেই।

আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী নিয়ে কথা হয় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম ও ইছাক মিয়ার সঙ্গে। তারা দু’জনেই অভিন্ন সুরে বলেন, তাজুল ইসলাম এমপি হওয়ার পর দুই উপজেলায় যে উন্নয়ন হয়েছে, এর আগে তা হয়নি। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী এ নেতার জনপ্রিয়তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তিনি তার মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে গোটা এলাকাকে শান্তিতে পরিণত করেছেন। এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন করা ছাড়াও শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তার অবদান অনেক। তার কল্যাণেই লাকসাম পৌরসভার রাস্তাঘাটের উন্নয়নে এডিবির মাধ্যমে ২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ পাওয়া যায়। লাকসামকে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণেও তার অবদান অনেক। এমপির কারণেই এলাকার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সব অঙ্গসংগঠন আজ ঐক্যবদ্ধ। এ আসনে বর্তমান এমপির বিকল্প নেই। তাজুল ইসলাম এমপি বলেন, শেখ হাসিনার উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য মানুষ আগামী নির্বাচনে নৌকায় ভোট দেবেন, ইনশাআল্লাহ। আমি বঙ্গবন্ধুকন্যার পাশে থেকে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকর।

অপরদিকে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপিতে বিরাজ করছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। দীর্ঘদিন সংসদের বাইরে থাকা এই দলে দুটি গ্রুপের অস্তিত্ব স্পষ্ট। এক গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিম এবং অপর গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন শিল্পপতি আবুল কালাম। এ দুই গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের চিত্র এলাকাবাসী প্রায়ই প্রত্যক্ষ করছেন। গত বছর আকস্মিকভাবে কোনো সম্মেলন ছাড়াই কালাম সমর্থিতদের দিয়ে কমিটি গঠনের পর থেকেই সংঘাতের শুরু। আজিম গ্রুপের লোকেরা কালাম গ্রুপকে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বিএনপির এ দুই নেতাই আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে তারা নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত থাকার চেয়ে একজন আরেক জনকে ঠেকাতেই ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কথা হয় বিএনপির সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিমের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘হামলা, মামলা ও গ্রেফতারের কারণে স্বাভাবিকভাবে দলের কর্মকাণ্ড চালাতে ব্যাঘাত ঘটছে। গ্রাম থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হচ্ছে। লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ হচ্ছে বিএনপির দুর্গ। যারা বিগত নির্বাচনে দলের প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেছেন এবং দলের নিশ্চিত বিজয় নস্যাৎ করেছেন, তারা কোনোভাবেই দলের পরিচয় বহন করতে পারে না। আমি সব সময় দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে আছি, থাকব। নমিনেশন নয়, লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলায় দলকে সুসংগঠিত করে আগামী নির্বাচনে দলকে বিজয়ী করাই আমার লক্ষ্য। আমাদের নেত্রীকে জেলে রেখে বর্তমান সরকার একদলীয় নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে। এতে তারা সফল হবে না।’

জাতীয় নির্বাহী কমিটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বর্তমান সরকারের অধীনে একদলীয় নির্বাচনে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। কর্নেল (অব.) আজিম দল থেকে পদত্যাগ করায় তিনি এখন আর দলের কেউ নন। আজিম মনোনয়ন পাওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ সদস্য পদ না থাকায় দলীয় মনোনয়নপত্র তিনি কিনতেও পারবে না। এলাকায় বিএনপিতে কোনো গ্রুপিং নেই। কর্নেল (অব.) আজিমের পদত্যাগের মাধ্যমে সব গ্রুপিং শেষ হয়ে সবাই মূল ধারায় ফিরে এসেছেন।’

কথা হয় বিএনপির অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী সফিকুর রহমান সফিকের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক ছিলাম। এ ছাড়া সারা জীবন বিএনপির জন্য কাজ করেছি। আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। তবে অন্য কাউকে দিলে তার পক্ষেই কাজ করব। বিএনপির অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী ড. রশিদ আহম্মদ হোসাইনী যুগান্তরকে বলেন, জিয়ার আদর্শে বিশ্বাস করি। তার সৈনিক হিসেবে দল করতে গিয়ে কখনও চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাইনি। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে আস্থাশীল। সবারই আশা থাকে ওপরে ওঠার। আমার ইচ্ছা আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার। দল জানে আমি আবিষ্কার নই, সংস্কার নই এবং বহিষ্কারও নই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল যে সিদ্ধান্ত দেবে, তার প্রতি আস্থা আছে। তবে আমার বিশ্বাস, দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে।

জাতীয় পার্টির কুমিল্লা দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনয়নপ্রত্যাশী অধ্যাপক আবদুল খালেক দুলাল বলেন, অতীতে জাতীয় নির্বাচনে দল অংশগ্রহণ করেছে। এ আসনে পল্লীবন্ধু এরশাদের বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান এরশাদের আশীর্বাদ নিয়ে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জাতীয় পার্টির নেতা প্রফেসর ড. গোলাম মোস্তফা। আগামী নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন বৃহত্তর লাকসামের বিএলএফ ডেপুটি কমান্ডার এবং বিএনপির সাবেক এমপি এটিএম আলমগীর, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সেলিম মাহমুদ গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

Related posts