আওয়ামী লীগে একক প্রার্থী বিএনপিতে দু’জনের লড়াই (কুমিল্লা-১০)

সোনালী দেশ ডটকম:: 

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ ও নাঙ্গলকোট উপজেলা নিয়ে সংসদীয় কুমিল্লা-১০ আসন। এ আসনের দুই উপজেলাতেই আওয়ামী লীগ শক্তিশালী অবস্থানে। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখান থেকে আওয়ামী লীগ থেকে একজনই অংশ নেবেন। তিনি এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল)। তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি।

বিপরীতে দলীয় কোন্দলে অনেকটাই বিপর্যস্ত বিএনপি। সাবেক সংসদ সদস্য (নাঙ্গলকোট) আবদুল গফুর ভূঁইয়া ও নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে চান ধানের শীষ প্রতীকে। এ লক্ষ্যে পৃথকভাবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তারা।

জাতীয় পার্টিতেও এখানে মনোনয়নপ্রত্যাশী দু’জন। এরা হলেন- নাঙ্গলকোট উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আলী আহম্মদ মোল্লা এবং জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহিলা সম্পাদক ও সদর দক্ষিণ জাতীয় মহিলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক জোনাকী মুন্সি। জোনাকী জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত হুমায়ুন কবির মুন্সির স্ত্রী। অন্য কোনো দলের কাউকে প্রচারে নামতে দেখা যায়নি।

সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ (শহরতলী, সদর উপজেলার একাংশ) ও নাঙ্গলকোট উপজেলা নিয়ে এ আসন গঠন করা হয়। এর আগে সদর দক্ষিণ লাকসাম উপজেলার সঙ্গে কুমিল্লা-৯ আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। নাঙ্গলকোট ছিল কুমিল্লা-১১ আসন। কুমিল্লা ৯-এ ১৯৯১ সালে বিএনপির এটিএম আলমগীর, ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগের তাজুল ইসলাম, ২০০১-এ বিএনপির কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিম এমপি নির্বাচিত হন। নাঙ্গলকোট কুমিল্লা ১১-তে থাকাকালে ১৯৯১ সালে বিএনপির ডা. একেএম কামরুজ্জামান, ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগের জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া, ২০০১-এ বিএনপির আবদুল গফুর ভূঁইয়া এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে এ আসনে (কুমিল্লা-১০) এমপি নির্বাচিত হন আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল)। ২০১৪ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, লোটাস কামাল নির্বাচিত হওয়ার পর ব্যাপক উন্নয়নে নাঙ্গলকোটের চিত্রই পাল্টে গেছে। এলাকায় রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির, মক্তব-মাদ্রাসাসহ সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। বর্তমানে নাঙ্গলকোটের শতভাগ বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতায়িত। ৯৫ ভাগ রাস্তা পাকা। জাতীয়করণ করা হয়েছে হাসান মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজ ও এআর মডেল হাই স্কুল। নাঙ্গলকোট পৌরসভাকে খ শ্রেণীতে উন্নীত করে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে পৌর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এসব কারণে এক সময়ে এখানে বিএনপির ভালো জনসমর্থন থাকলেও এখন আওয়ামী লীগই জনপ্রিয়। উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ভাইস চেয়ারম্যানসহ সব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দলীয় মনোনয়নে (আওয়ামী লীগ) নির্বাচিত হওয়া তার বড় প্রমাণ।

আওয়ামী লীগ নেতারা আরও জানান, সাবেক কুমিল্লা সদর দক্ষিণ পৌরসভা বর্তমানে কুমিল্লা সিটি কর্র্পোরেশনের ৯টি ওয়ার্ড হিসাবে অন্তর্ভুক্ত। এ ওয়ার্ডগুলো ও সদর উপজেলার ১৪ ইউনিয়নেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা ইপিজেড প্রতিষ্ঠা, লালমাই উপজেলা গঠন, লালমাই কলেজকে সরকারিকরণ এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নসহ এ উপজেলার প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় উন্নয়নে কাজ করেছেন লোটাস কামাল।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বাগমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল মালেক বলেন, উন্নয়নের যতকিছু আছে তার সব কিছুই করেছেন এ এলাকার সংসদ সদস্য বর্তমান সরকারের দক্ষ পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি শুধু উন্নয়ন নয়, বহু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনে ওনার বিকল্প প্রার্থী এ এলাকায় নেই।

নাঙ্গলকোট উপজেলা চেয়ারম্যান শামছুদ্দিন কালু বলেন, পূর্বে যারা এ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন কেউ এলাকার উন্নয়নে কাজ করেননি। লোটাস কামালের উন্নয়ন-উদ্যোগে নাঙ্গলকোট দেশের মডেল উপজেলায় রূপান্তরিত হয়েছে। এ নেতা (লোটাস কামাল) তার সততা ও উন্নয়নের মাধ্যমে নাঙ্গলকোটের মানুষের হƒদয়ে পৌঁছে গেছেন। এখন নাঙ্গলকোটের নাম এলেই আসে লোটাস কামালের নাম। আসন্ন নির্বাচনে তার মনোনয়ন ও জয় নিশ্চিত।

এ বিষয়ে কথা বলতে শনিবার সারা দিন মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় আ হ ম মুস্তফা কামালের সঙ্গে। প্রতিবারই তার ব্যক্তিগত সহকারী যুগান্তরকে জানিয়েছেন, ‘স্যার ব্যস্ত রয়েছেন।’

আবদুল গফুর ভূঁইয়া ও মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মধ্যে গ্র“পিংয়ের প্রভাব স্পষ্ট এ আসনে বিএনপির দলীয় কর্মকাণ্ডেও। দুই নেতার অনুসারী তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝেও এ কোন্দলের প্রভাব পড়েছে। ফলে এ সংসদীয় আসনের দুই উপজেলাতেই সাংগঠনিকভাবে দুর্বল দলটি। প্রার্থী হওয়ার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলেন, বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন, শুভেচ্ছা বার্তা, পোস্টার ও কার্যক্রম থেকে স্পষ্ট দু’জনই বিএনপির মনোনয়ন চাইছেন। মাঠপর্যায়ে আবদুল গফুর ভূঁইয়ার ভালো প্রভাব রয়েছে। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নাঙ্গলকোটের ৮টিতেই তার সমর্থকরা মনোনয়ন পান। তবে কমিটিগুলোতে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার সমর্থনই বেশি। নাঙ্গলকোট উপজেলা যুবদল সভাপতি আনোয়ার হোসেন (ছোট নয়ন) বলেন, মোবাশ্বেরের যেসব কমিটি আছে সেগুলো শুধু কাগজে-কলমে। বাস্তবে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল আবদুল গফুর ভূঁইয়ার নেতৃত্বে আছে।

কথা হয় আবদুল গফুর ভূঁইয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, নাঙ্গলকোট উপজেলাটি সংসদীয় ১১ আসনে থাকাকালে এ উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রে আমি ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। মানুষের হƒদয়ের কাছাকাছি ছিলাম, এখনও আছি। আমি রাজনীতি করে পকেট ভারি করিনি, রাজনীতির মাধ্যমে সেবা করি। আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশ না থাকলে এবং জনগণ ভোট দিতে পারলে, আমি বিএনপি থেকে প্রার্থী হলে জনগণই আমাকে বিজয়ী করবে।

দলের গ্র“পিং সম্পর্কে প্রশ্ন করলে আবদুল গফুর ভূঁইয়া বলেন, ১/১১ সরকারের আমলে যখন রাজনীতিবিদরা দিশেহারা, তখন আমাদের কিছু জনবিচ্ছিন্ন ও সুবিধাবাদী নেতা সেটাকে পুঁজি করে কমিটি বাগিয়ে আনলেও মাঠে তাদের তেমন অবস্থান নেই। মাঠে আমার অবস্থান সুদৃঢ় ও শক্তিশালী। তিনি বলেন, ‘নাঙ্গলকোট আসনটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এলাকার জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে আমি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। আদালত সেটিকে আগের স্বতন্ত্র আসনে ফিরিয়ে দিতে রায় দিয়েছেন। আশা করি আমরা নাঙ্গলকোটবাসী সেটি ফিরে পাব।’

মোবাশ্বের আলম যুগান্তরকে বলেন, বিগত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১০ ও ১১ আসনে নির্বাচন করেছিলাম (১০ম নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি)। তখন থেকে বিগত ৯ বছর দলের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। দলীয় সব কর্মসূচি কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী পালন করতে গিয়ে ১০টি মামলার আসামি হয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেছি। বর্তমানে দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে আছি। আমার ৩২ ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ ও সব অঙ্গসংগঠনের কমিটি সুসংগঠিত আছে। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে দলের যে কোনো প্রয়োজনে নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে উজাড় করে দেব। আমার নির্বাচনী এলাকা বিএনপির উর্বর ঘাঁটি, এ আসন থেকে দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি দলকে সুনিশ্চিত বিজয় উপহার দিতে পারব।

জাতীয় পার্টির কাউকে এখনও তেমন প্রচারে দেখা যায়নি। মনোনয়নপ্রত্যাশী জোনাকী মুন্সির সঙ্গে কথা হয়। তিনি যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় পার্টির শাসনামলে পল্লী বন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সারা দেশের ন্যায় কুমিল্লায়ও অনেক উন্নয়ন করেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেসব কর্মকাণ্ডের কথা বিবেচনা করে আগামী নির্বাচনেও কুমিল্লার মানুষ লাঙ্গলে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে। জাতীয় পার্টির আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী আলী আহম্মদ মোল্লা বলেন, দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ আমি দলের মান রাখতে পারব।

Related posts