জাবিতে ‘তারুণ্যের চোখে নির্বাচন ও গণভোট’ শীর্ষক বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত।

মোঃ তাহমিদুর রহমান, জাবি প্রতিনিধি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) তারুণ্যের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, নীতিনির্ধারণে তরুণদের ভূমিকা এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের গুরুত্ব নিয়ে ‘তারুণ্যের চোখে আগামী নির্বাচন ও গণভোট’ শীর্ষক একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত জহির রায়হান মিলনায়তনের সেমিনার কক্ষে এ আয়োজন করা হয়। সেমিনারটির যৌথ আয়োজক ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য সাদিক আল আরমান।

সেমিনারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মেহেদী মামুন বলেন, দেশের একটি বড় অংশের তরুণ এখনো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি এবং বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ ভোটারের সংখ্যা চার কোটিরও বেশি। ফলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অনেকাংশেই তারুণ্যনির্ভর হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলেও গণভোটের প্রশ্নে তারা নিরপেক্ষ না, গণভোটের পক্ষ তাদের কথা বলা প্রয়োজন কারণ যে সংস্কারগুলোর ভিত্তিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, জুলাইয়ের আন্দোলনে দেশের মানুষ রক্ত ঝরিয়ে সেই সংস্কার গুলোর জন্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বসিয়েছে ।

জাবিসাসের সাবেক সভাপতি ও ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশের সংগঠক প্লাবন তারিক বলেন, তরুণরা এখন সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বমুক্ত কল্যাণভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি চায়, যার প্রতিফলন সাম্প্রতিক ক্যাম্পাস রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তরুণদের প্রধান প্রত্যাশা হলো কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। গণমাধ্যম দমন ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করে উল্লেখ করে তিনি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত মতপ্রকাশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে গণতন্ত্র রক্ষায় তরুণদের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান তিনি।

সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। তিনি জানান, দেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী তরুণ ভোটার মোট ভোটারের ৪৩ শতাংশের বেশি, যা একটি শক্তিশালী সিদ্ধান্তগ্রহণকারী শক্তি। তরুণদের উচিত দল নয়, প্রার্থীর নৈতিকতা, নেতৃত্বগুণ ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। শুধু ভালো মানুষ হলেই পরিবর্তন আসে না—যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন তরুণদের জন্য বাস্তব পরিবর্তন আনার বড় সুযোগ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার সব ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে রয়েছে নৈতিকতা; নৈতিকতার ভিত্তি ছাড়া উন্নয়ন, রাজনীতি কিংবা কূটনীতি টেকসই হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, পাঁচ কোটির বেশি তরুণ এখন ভোটাধিকারভুক্ত হওয়ায় আগামী জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে তরুণরাই হবে প্রধান সিদ্ধান্তগ্রহণকারী শক্তি। তরুণদের সামনে দুটি পথ—পুরোনো সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি অথবা মানবিক ও কল্যাণভিত্তিক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এম. মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান শোষণের শিকার হয়েছিল এবং স্বাধীনতার পর বহু আন্দোলন হলেও সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পুরোপুরি পায়নি। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত শক্তি হলো যুবসমাজ। তরুণদের কখনোই একটি ইতিবাচক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি; বরং তাদের ব্যবহার ও বিভ্রান্ত করা হয়েছে। ফলে দেশের উন্নয়নে যুবশক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি।
তিনি আরও বলেন, শুধু নির্বাচন নয়—গণভোট আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই অভ্যুত্থানে রক্তের বিনিময়ে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা স্থায়ী করতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কারগুলোকে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সম্মতিতে বৈধতা দিতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমানে রাজনীতিতে পদ ও মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা বেশি হলেও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ও গণভোট নিয়ে আলোচনা কম, যা উদ্বেগজনক। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নির্বাচন যথেষ্ট নয়; এর জন্য নৈতিকতার ভিত্তি প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকলে রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রও টেকসই হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এছাড়াও সেমিনারে কথা বলেন, জাকসুর এজিএস ফেরদৌস আল হাসান,এজিএস আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা, লেখক ও এক্টিভিট মুহাম্মদ সজল ক্যাম্পাস মিরর এর সম্পাদনা সহযোগী সালাহউদ্দিন, সরকার ও রাজনীতি বিতর্ক মঞ্চের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম সহ অনেকে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *