জাবিতে ভুয়া তথ্য দিয়ে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদন; দুই বছরেও কাজ করেনি তদন্ত কমিটি

মোঃ তাহমিদুর রহমান, জাবি প্রতিনিধি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত নয় এমন গবেষণা প্রবন্ধকে ‘প্রকাশিত’ দেখিয়ে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদন করার অভিযোগে সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরার বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত যাচাই কমিটির রিপোর্ট দুই বছর পার হলেও দেয়া হয়নি।

২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা বিভাগীয় চেয়ারম্যান এবং কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেন। তার জমাকৃত গবেষণা প্রোফাইলে ১১টি প্রকাশিত প্রবন্ধের তালিকা থাকলেও তার মধ্যে ২টি প্রবন্ধই ছিল অপ্রকাশিত।

অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর বিভাগীয় একটি তদন্ত যাচাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফা সুলতানা। অন্যান্য সদস্যরা হলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. জসীম উদ্দীন, অধ্যাপক ড. খোঃ লুৎফুল এলাহী, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী ও অধ্যাপক ড. আনিছা পারভীন। কমিটিকে ২১ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি করে পরবর্তী বিভাগীয় সভায় উপস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

তবে দীর্ঘ দুই বছরেও তদন্ত কমিটি এই ব্যাপারে কিছুই করেননি।

ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. এমরান জাহান বলেন, “দু’বছর আগে এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. আরিফা সুলতানাকে সভাপতি করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ থাকলেও আজ অবধি এ কমিটি আমার কাছে কোন প্রতিবেদন জমা দেয় নি।”

তদন্ত যাচাই কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. আরিফা সুলতানার সঙ্গে যোগাযোগ করে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হোসনে আরার পদোন্নতি সম্পর্কে অভিযোগের সত্যতা যাচাই নিয়ে আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে আমরা নিজেরাই সমাধান করেছি। এ কারণে তদন্ত কমিটি আর বিষয়টি নিয়ে কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়নি।”

তিনি আরও জানান, “হোসনে আরার বিরুদ্ধে অপ্রকাশিত প্রবন্ধ জমা দেওয়ার অভিযোগটি সঠিক নয়। তার আবেদনপত্রে মোট ৮টি প্রবন্ধের উল্লেখ ছিল, যার মধ্যে ৭টি ছিল প্রকাশিত। যা পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে।পরে তিনি আবেদন থেকে অপ্রকাশিত প্রবন্ধটি বাদ দেন এবং প্রায় ১০ মাস পর বোর্ড পুনরায় তার আবেদন গ্রহণ করে যাচাই–বাছাই শেষে হোসনে আরাকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়।”

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. খোঃ লুৎফুল এলাহী বলেন, “হোসনে আরা দুটি অপ্রকাশিত প্রবন্ধকে গৃহীত বলে দেখালেও সেটার কোনো গ্রহণপত্র ছিল না। বিষয়টি স্পষ্টতই জালিয়াতির পর্যায়ে পড়ে।” আবেদনপত্রের অসংগতি দেখে তৎকালীন নিয়োগ বোর্ডের বহিস্থ পরীক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক ড. আশফাক হোসেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোর্তুজা খালেদ আবেদনটি বাতিল করেন। তারপর যদিও প্রায় ১০ মাস পরে পুনরায় বোর্ড কর্তৃক জ্যেষ্ঠতা বজায় রেখে পদোন্নতি দেয়া হয়।”

তদন্ত সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অভিযোগ সত্য মিথ্যা যাই হোক এটি একটি গুরুতর অভিযোগ ছিল।তদন্ত কমিটির দায়িত্ব ছিল বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখার।কিন্তু কমিটি তদন্ত সংক্রান্ত কোনো সভার আয়োজন করতে পারেনি এবং কোনোরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।তৎকালীন উপাচার্যও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেননি। একজন সহকর্মী হিসেবে আমি চাই এই অভিযোগের সত্য মিথ্যা যাচাই করা হোক।

উল্লেখ্য যে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় মদদ দেওয়ায় তাকে শেখ হাসিনা হলের (বর্তমান — জুলাই চব্বিশ জাগরণী হল) প্রাধ্যক্ষ থাকাকালীন শিক্ষার্থীরা তাকে বহিষ্কার করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পেছনে দায়ী থাকার অভিযোগে পরবর্তীতে জাবি প্রশাসন কর্তৃক বরখাস্ত হওয়া ৯ জন শিক্ষকের মধ্যে তিনিও বরখাস্ত হন।

…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *