স্টাফ রিপোর্টার, সোনালী দেশ ডেস্ক:
এনসিপি, এলডিপি এবং এবি পার্টি শেষ সময়ে যুক্ত হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলের আসন সমঝোতায় টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এই তিনটি দলকে ৪০ আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে আট দলের কে কতটি আসন ছাড়বে– এ নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা।
জামায়াতের প্রস্তাব ছিল নতুন তিন শরিকের জন্য তারা ১৬, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ১৬ এবং বাকি ছয় দল আটটি করে আসন ছাড়বে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নিজ নিজ ভাগ থেকে এত আসন ছাড়তে রাজি নয়। তাদের ভাষ্য, নতুন শরিকদের আসন ছাড়তে হবে জামায়াতের ভাগ থেকে। এই জটিলতার কারণে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর আসন বণ্টনের সুরাহা হয়নি।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের নির্বাচনী সমঝোতা সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে সমকালকে। আসন বণ্টনের আলোচনায় দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব করা নেতারা জানিয়েছেন, এনসিপিকে ৩০, এলডিপিকে সাত এবং এবি পার্টিকে তিনটি আসন ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কোন কোন দল তাদের জন্য কতগুলো আসন ছাড়বে, তা চূড়ান্ত না হওয়ায় সমঝোতা হচ্ছে না। বরং দিন দিন জটিলতা বাড়ছে।
জোটের ভাঙাগড়ায় সমস্যার শুরু
গত মে মাসে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত আন্দোলন মিলে নির্বাচনী মোর্চা গঠনের প্রচেষ্টা শুরু হয়। তবে এই উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে জমিয়ত চলে যায় বিএনপি জোটে।
ইসলামপন্থিদের ভোট ‘এক বাক্সে’ আনতে গত সেপ্টেম্বরে জামায়াত এতে যোগ দেয়। যুক্ত হয় জাগপা এবং বিডিপিও। ওই সময়ে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ এবং এবি পার্টিও আলোচনায় যোগ হয়। তবে নিম্নকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিতে রাজি না হয়ে চলে যায় ওই তিনটি দল।
গত নভেম্বরে জোট করে এনসিপি, এবি পার্টি এবং বিএনপির জোট ছেড়ে আসা রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন। এনসিপির সঙ্গে জোটের আলোচনা করেও পিছিয়ে যায় গণঅধিকার। এ দলটি শেষ পর্যন্ত বিএনপির জোটে যায়। এনসিপি এবং এবি পার্টি গত ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চালায়। তা ব্যর্থ হওয়ায় গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। যা প্রকাশ্যে আসে ২৬ ডিসেম্বর। পরের দিন জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় এনসিপি। ৩০ আসনের সমঝোতা হলেও, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের গঠিত এই দলটি আরও কয়েকটি আসন চায়। তারা ৪৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবীক্রমের এলডিপি ১৩ বছর ছিল বিএনপির জোটে। দলটির মহাসচিব রেদওয়ান আহমদ ২৪ ডিসেম্বর বিএনপিতে যোগ দেন। এতে ক্ষুব্ধ অলি আহমদ ২৬ ডিসেম্বর জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। পরের দিন জোটে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। সাত আসনে সমঝোতা হলেও এলডিপি ২৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
এবি পার্টিকে তিনটি আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া জামায়াত দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর জন্য ফেনী-২ এবং সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া ফুয়াদের জন্য বরিশাল-৩ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী দেয়নি। তবে এবি পার্টি অন্তত ছয়টি আসন চায়। সে কারণে দুটি আসনে ছাড় নিশ্চিত হলেও, জামায়াতের জোটে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
এনসিপি নাকি চরমোনাই– কে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ নিয়ে বিরোধ
বিএনপির সঙ্গে ব্যর্থ আলোচনা পর জামায়াতকে এনসিপির শর্ত ছিল, জোটে তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে স্বীকার করতে হবে। এনসিপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আলোচনায় পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, ইসলামী আন্দোলনের চেয়ে অন্তত একটি আসন বেশি দিতে হবে। নির্বাচনী সমঝোতায় এনসিপিকে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে স্বীকার করতে হবে। তবে এতে ক্ষুব্ধ ইসলামী আন্দোলন। দলটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম সাংবাদিকদের সামনেই প্রশ্ন রাখেন, সারাদেশে এনসিপির কত ভোট আছে? তাদের কী সাংগঠনিক শক্তি আছে?
আসন বণ্টন আলোচনায় থাকা জামায়াতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, দলীয় জরিপ অনুযায়ী, সারাদেশে এনসিপির ৬ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে। জুলাই চেতনার কারণেও নতুন দলটির গুরুত্ব রয়েছে। তাই এনসিপির প্রার্থী সংকট এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার পরও দলটিকে জামায়াত আগ্রহ করে জোটে নিয়েছে। এনসিপির জোটসঙ্গী হিসেবে এবি পার্টিকেও নিতে হয়েছে। বিএনপি ছেড়ে আসা এলডিপির প্রধান খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। তাই দলটিকে হাতছাড়া করা হয়নি। লেবার পার্টি, ১২ দলীয় জোটসহ আরও অনেকে বিএনপির কাছ থেকে আসন না পেয়ে জোটে আসতে চেয়েছিল, তাদের জামায়াত নেয়নি।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, আট দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এনসিপি, এলডিপি এবং এবি পার্টিকে নির্বাচনী সমঝোতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। জামায়াত একা সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে আসন সবাইকে ছাড়তে হবে।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, জামায়াতের সঙ্গে আলোচনায় ৩০ আসনে সমঝোতা হয়েছে। জোটেরই অন্য কোনো দল যদি প্রার্থী রাখে এসব আসনে, তাহলে জামায়াতকে এর দায়িত্ব নিতে হবে।
আসন সুরাহা আটকে আছে
এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এলডিপি, খেলাফত মজলিস, বিডিপির জন্য ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। তবে ইসলামী আন্দোলনের জন্য কোনো আসন খালি রাখেনি। আবার ইসলামী আন্দোলন যেসব আসন জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেখানেও মনোনয়ন জমা দিয়েছেন হাতপাখার প্রার্থীরা। জামায়াত ২৭৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী দিয়েছে ২৬৮ আসনে। এনসিপি, এবি, এলডিপিকে জামায়াতের ছেড়ে দেওয়া আসনেও রয়েছে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী।
জামায়াত এখন পর্যন্ত হাতপাখাকে ৩১ আসন ছাড়তে সম্মত হলেও দলটি জোটে থাকতে অন্তত ৭৫ আসনে নির্বাচন করতে চায়। মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফতকে ১৩টি আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত। তবে তারা অন্তত ২২টি আসন চায়। এনসিপির মতো নতুন দলকে ‘বেশি গুরুত্ব দিয়ে’ ৩০ আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারাও ক্ষুব্ধ।
জামায়াতের হিসাব অনুযায়ী, ২৪৮ আসনে সমঝোতা হয়েছে। বাকি ৫২ আসনে জরিপ করে প্রার্থী ঠিক করার প্রস্তাব করেছে। ২৪৮ আসনের ১৭১টি জামায়াত নিজে লড়তে চায়। বাকি ৭৭টি শরিকদের ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জরিপের জন্য রাখা ৫২ আসনেরও অর্ধেকে জামায়াত দলীয় প্রার্থী দিতে চায়। তবে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত এই প্রস্তাব মানেনি।
জামায়াতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, চরমোনাইর পীরের ভাগে ৫০টি আসন রাখা হয়েছিল। কিন্তু এনসিপি, এলডিপি, এবি যোগ দেওয়ায় তাদের ১৬ আসন ছাড়তে বলা হয়েছে। জামায়াতও নিজের ভাগ থেকে ১৬টি ছাড়বে। কিন্তু ৪০টি আসন জামায়াতের একার পক্ষে ছাড়া অসম্ভব।
বাংলাদেশ খেলাফতের একজন নেতা বলেন, তারা অন্তত ২৫ আসন চেয়েছিলেন। এনসিপি, এলডিপি, এবির জন্য তিনটি আসন ছাড়তে চান। কিন্তু জামায়াত ১৩টি থেকে কমিয়ে ১১ আসন দিতে চাইছে– এ প্রস্তাব মানা অসম্ভব। এনসিপি জোটে আসায় পুরোনো মিত্রদের অবজ্ঞা করা হচ্ছে, যা জোট ভাঙার কারণ হতে পারে।
কী বলছেন নেতারা
জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফতের নেতারা অবশ্য প্রকাশ্যে সবাই বলছেন, আসন বণ্টনে সমস্যা নেই। আলোচনা চলমান রয়েছে। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগে সব ঠিক হয়ে যাবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুল হালিম সমকালকে বলেছেন, নতুন শরিকদের সবাই মিলে ছাড় দিয়ে সমঝোতা হয়ে যাবে। সবাই আন্তরিক রয়েছে।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, আলোচনার পর কোনো সমস্যাই থাকবে না।
ফয়জুল করীম বলেছেন, কোনো দল যদি এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাহলে সমস্যা। সবাই মিলে এগোলে সমস্যা নেই।