“নিজেই অসুস্থ লাকসাম সরকারি হাসপাতাল”

দেলোয়ার হোসেন, লাকসাম (কুমিল্লা):

দেয়ালে ফাটল, ছাদ থেকে খসে পড়ছে ফলেপ—এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কার্যক্রম। জীবন ঝুঁকি নিয়ে এখানকার চিকিৎসক ও কর্মচারীরা প্রতিদিন রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। অন্যদিকে পরিত্যক্ত আবাসিক কোয়ার্টারগুলো পরিণত হয়েছে মাদকসেবী ও অপরাধীদের আখড়ায়। কয়েক মাস আগে এসব কোয়ার্টারের একটিতে এক যুবকের গলাকাটা লাশও উদ্ধার করা হয়।

১৯৬৫ সালে নির্মিত এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন এখানে লালমাই, নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলা থেকে এক হাজারেরও বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটি নিজেই এখন নানা সমস্যায় আক্রান্ত।

‘ভবন ভেঙে পড়ার ভয়ে থাকি সব সময়’

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনের ছাদ ও দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। জানালার গ্রীল বাঁকা হয়ে গেছে। নারী ও শিশু ওয়ার্ডের অবস্থা আরও নাজুক—ডেলিভারি কক্ষ ও টয়লেটে দরজা-জানালা নেই। এক নারী রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,

“এটা হাসপাতাল না, যেন উন্মুক্ত গোয়ালঘর! সন্তান জন্ম দিতে এসে ইজ্জত নিয়ে ফিরতে কষ্ট হয়।”

ভর্তি থাকা এক গৃহিণী জানান,

“রাতে ঘুমাতে পারি না, মনে হয় এখনই ভবনের ফাটল ভেঙে পড়বে।”

ডাক্তার-কর্মচারীদেরও নেই আশ্রয়

ডাক্তার ও নার্সদের জন্য কোনো আবাসন না থাকায় তারা দুর্ভোগে আছেন। অনেকে প্রতিদিন দূর থেকে এসে সেবা দেন। হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন,

“আমরা মানুষ না যেন! সারাক্ষণ কাজ করি, কিন্তু বিশ্রামের জায়গা নেই। যে টাকা বেতন পাই, তার বেশিরভাগই ভাড়া দিতে হয়।”

সিনিয়র স্টাফ নার্স মঞ্জুমা বেগম বলেন,

“আঘাত রোগীদের সেবা দিতে ভয় লাগে, জানি না কখন ভবনের অংশ ধসে পড়ে।”

‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই অসুস্থ’

আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. কামরুল হাসান রিয়াদ জানান,

“ভবনটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ। ফাটল ধরে অংশবিশেষ খসে পড়ছে। আমরা বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি।”

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাজিয়া বিনতে আলম বলেন,

“লাকসাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বৃহত্তর লাকসামের মানুষের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র। কিন্তু ভবনটি এতটাই জরাজীর্ণ যে, যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পুরনো কোয়ার্টারগুলো মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ডাক্তার-নার্স সবাই আতঙ্কে কাজ করছেন।”

ঠিকাদারের কাজ বন্ধ, বাড়ছে ঝুঁকি

সম্প্রতি হাসপাতালটি ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের অংশ শেষ না করেই চলে গেছে। ফলে নির্মাণ সামগ্রী পড়ে থেকে প্রতিদিন দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *