মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ২০২তম জন্মবার্ষিকী: বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার মহানায়ককে বিনম্র শ্রদ্ধা

মেহেদী হাসান রিপন,স্টাফ রিপোর্টারঃ

আজ ২৫ জানুয়ারি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্বর্ণালি দিন। আজ থেকে ২০২ বছর আগে ১৮২৪ সালের এই দিনে যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার পুরোধা পুরুষ— মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। কপোতাক্ষ নদের কলকল ধ্বনি আর পল্লী-প্রকৃতির মায়ায় বেড়ে ওঠা এই ক্ষণজন্মা পুরুষই বাংলা সাহিত্যের জড়তা ভেঙে তাকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে আসীন করেছিলেন।মহাকবির ২০২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জন্মভূমি সাগরদাঁড়িতে এখন সাজ সাজ রব। প্রতিবছরের মতো এবারও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী ‘মধুমেলা’। কবির স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন, সেই বিখ্যাত বকুলতলা আর কপোতাক্ষ নদের পাড় এখন মধু-ভক্তদের পদচারণায় মুখরিত। মেলা প্রাঙ্গণে বসেছে লোকজ সামগ্রীর পসরা, আর মূল মঞ্চে চলছে কবির জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা এবং মধু-সংগীতের আসর। দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক ও গবেষকরা সমবেত হয়েছেন এই মহান শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানাতে।

মধুসূদন দত্ত কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক বিদ্রোহী সত্তা। তাঁর জীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। হিন্দু কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি পাশ্চাত্য জীবনযাত্রার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চাকে জীবনের লক্ষ্য বানান। ১৮৪৩ সালে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে তিনি হন ‘মাইকেল’। কিন্তু বিলেত যাওয়ার অদম্য বাসনা আর ইংরেজি কবি হওয়ার স্বপ্ন একসময় তাঁকে জীবনের রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি করে। শেষ পর্যন্ত তিনি অনুধাবন করেন, নিজের শিকড় আর মাতৃভাষাই হচ্ছে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।মধুসূদন বাংলা সাহিত্যের প্রথাগত পয়ার ছন্দের দেয়াল ভেঙে প্রবর্তন করেন ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’। তাঁর এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বাংলা কবিতাকে আধুনিকতার মুক্তি দান করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তিগুলো হলো:মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১): এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও সার্থক মহাকাব্য। পৌরাণিক কাহিনীকে নতুন দৃষ্টিতে দেখে রাবণকে বীর হিসেবে চিত্রিত করে তিনি এক অভাবনীয় সাহসিকতার পরিচয় দেন।ইংরেজি ও ইতালীয় ধারার সনেটকে বাংলায় প্রথম সফলভাবে প্রয়োগ করেন তিনি। তাঁর ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটটি আজও দেশপ্রেমের এক অনন্য দলিল।‘শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’ এবং ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকের মাধ্যমে তিনি বাংলা নাটকের ভিত্তি স্থাপন করেন। আবার ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারেও ভূমিকা রাখেন।

সুদূর ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে বসে যখন তিনি অর্থাভাব আর কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন তাঁর হৃদয়ে বেজে উঠেছিল স্বদেশের কপোতাক্ষ নদের সুর। সেই ব্যাকুলতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল—”সতত হে নদ তুমি পড় মোর মনে, সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।” তাঁর এই আক্ষেপ এবং মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা আজও প্রতিটি বাঙালির জন্য প্রেরণার উৎস।আজকের এই বিশেষ দিনে কবির সমাধিতে এবং প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন অগণিত ভক্ত। বিশিষ্টজনদের মতে, মধুসূদন না এলে বাংলা সাহিত্য হয়তো আজও মধ্যযুগের দেব-নির্ভর কাহিনীতে আটকে থাকতো। তিনিই প্রথম আমাদের শিখিয়েছেন মানুষের জয়গান গাইতে।
জন্মবার্ষিকীর এই শুভক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক— মহাকবির সেই অক্ষয় লেখনী আর সাহসিকতাকে বুকে ধারণ করে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *