শাহীন আহম্মেদ
সাভার উপজেলা প্রতিনিধি
গত দেড় দশক আগে চাঁদপুরের রসু খাঁ ১০১ খুনের লক্ষ্য নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল দেশজুড়ে।ঠিক তার ১৫ বছর পর রাজধানী ঢাকার সাভারে মশিউর রহমান সম্রাট ওরফে ‘সাইকো সম্রাট’ এর করা নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো সেই পুরোনো ইতিহাস কে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
সম্প্রতি সাভারের মডেল থানা থেকে ৪০০ মিটার দূরে পরিত্যক্ত সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও আশপাশ থেকে গত ছয় মাসে ছয়টি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় সবুজ শেখ ওরফে সাইকো সম্রাট (৪০)কে।
গ্রেফতারের পর সম্রাট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর থেকেই আলোচনায় উঠে আসে ১৮ বছর আগের সেই রসু খাঁর নাম। দুজনের অপরাধের ধরনেই রয়েছে এক অদ্ভুত ও গা শিউরে ওঠা মিল। দুজনেই টার্গেট হিসেবে বেছে নিতেন নিম্নবিত্ত ও অসহায় নারীদের এবং হত্যার পর তাদের মধ্যে দেখা যেত চরম ভাবলেশহীনতা।
১০১ খুনের সেই বিভীষিকাময় শপথ: চাঁদপুর সদর উপজেলার মদনা গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া রসু খাঁর অপরাধ জগতের শুরু হয়েছিল ছিঁচকে চুরি দিয়ে। কিন্তু গাজীপুরের টঙ্গীতে এক নারী পোশাকশ্রমিকের কাছে প্রতারিত হওয়া এবং গণপিটুনির শিকার হওয়া তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রতিশোধের নেশায় সে শপথ নেয় ১০১ জন নারীকে হত্যার। মূলত গার্মেন্টস কর্মীরাই ছিল তার প্রধান টার্গেট। ২০০৯ সালে ধরা পড়ার আগে সে ১১ জন নারীকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করে।
নৃশংসতা ও হত্যার ধরন: রসু খাঁ মূলত ঢাকা, সাভার ও টঙ্গী এলাকার মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে চাঁদপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়ে যেত। সেখানে ধর্ষণের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাত-পা বেঁধে নদী, খাল বা ডোবার পানিতে মুখ চেপে ধরে চুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করত সে। এমনকি নিজের শালার স্ত্রীকেও হত্যা করতে দ্বিধা করেনি এই ঘাতক। অন্যদিকে সবুজ শেখও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের নিয়ে যেত পরিত্যক্ত ভবনে। সাভারের সেই পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি সম্রাটের কাছে ছিল এক ‘ডেথ ট্র্যাপ’। সেখানে নিয়ে সে গত ছয় মাসে অন্তত ছয়জনকে হত্যা করেছে। শুধু নারী নয়, তার শিকারে পরিণত হয়েছে পুরুষ ও শিশুও।
যেভাবে ধরা পড়েছিল রসু খাঁ: ২০০৯ সালের জুলাই মাসে তিন সন্তানের জননী পারভীন আক্তারকে হত্যা ছিল রসু খাঁর শেষ অপরাধ। চাতুরতার আশ্রয় নিয়ে সে নিজেই পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে রিকশাচালক সেজে তথ্য দেয়। কিন্তু এর আগে একটি মসজিদের ফ্যান চুরির মামলায় আটকের সময় তার রেখে যাওয়া সিম কার্ডের সূত্র ধরে শেষ রক্ষা হয়নি। ২০০৯ সালের ৮ অক্টোবর টঙ্গীর বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
বর্তমানে রসু খাঁ (৫২) গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির সেলে বন্দি আছে। সম্প্রতি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভবন পুনর্নির্মাণের কারণে তাকে এখানে স্থানান্তর করা হয়। কারাগার সূত্রে জানা গেছে, রসু খাঁ শারীরিকভাবে সুস্থ ও মানসিকভাবে যথেষ্ট শক্ত আছে। সাধারণ কয়েদিদের মতো কারাগারের খাবারই সে গ্রহণ করছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্বজন তাকে দেখতে কারাগারে আসেনি।
ভবঘুরে নারীদের ফুসলিয়ে শারীরিক সম্পর্ক, এরপর খুন করতেন সম্রাট: কোনো পাগল বা ভবঘুরেকে অনৈতিক যৌনাচারে লিপ্ত হতে দেখলেই তাদের ‘থার্টি ফোর’ বা ‘সানডে মানডে ক্লোজ’ করে দিতাম।’ সাভারে ছয় খুনের ঘটনায় আটক হওয়ার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এভাবেই বলেছিলেন ভবঘুরে মশিউর রহমান সম্রাট। এ সম্রাটই মুন্সিগঞ্জের সবুজ।
সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিন বলেন, সম্রাট পাগল নন। অতিরিক্ত নেশা করার কারণে তিনি কিছুটা মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মানুষ খুন করা তার নেশায় পরিণত হয়েছিল। তার ভাষায়, হত্যাকে তিনি ‘থার্টি ফোর’ বা ‘সানডে মানডে ক্লোজ’ বলে উল্লেখ করতেন।
হেলাল উদ্দিন বলেন, মশিউর রহমান সম্রাট তার আসল নাম নয়, তার প্রকৃত নাম ভিন্ন। নিজেকে নিরাপদ রাখতে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তার বাড়িও সাভারে নয়। হয়তোবা অন্য কোনো স্থানে আরও কোনো অপরাধ করে তিনি সাভারে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন এবং ভবঘুরে জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তবে শিগগিরই তার আসল নাম ও পরিচয় জানা যাবে।
তিনি বলেন, সাভারে আসার পর ভবঘুরে ওই সিরিয়াল কিলার বেশিরভাগ রাত কাটিয়েছেন সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার মডেল মসজিদে। ২০২৫ সালের ৪ জুলাই আসমা বেগম নামের এক বৃদ্ধকে হত্যার পর তিনি পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে চলে আসেন এবং ওই সেন্টারের নিচতলায় আস্তানা গাড়েন। এরপর থেকেই কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হতে থাকে। গত পাঁচ মাসে ওই ভবন থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ কারণে পুলিশের পক্ষ থেকে ওই সেন্টারে নিয়মিতভাবে নজরদারি চালানো হতো। সম্রাটও সন্দেহের বাইরে ছিলেন না। কিন্তু কোনো ক্লু বা প্রমাণের অভাবে তাকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছিল না।
হেলাল উদ্দিন আরও জানান, নজরদারির অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রাতে কমিউনিটি সেন্টার পরিদর্শনে গিয়ে এক কিশোরীকে সম্রাটের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। এসময় সম্রাট পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। জানতে চাইলে ওই কিশোরী সম্রাটকে তার ভাই বলে সম্বোধন করেন এবং তিন দিন আগে কমিউনিটি সেন্টারে এসেছেন বলে জানিয়েছিলেন। পরের রাতেই (শনিবার রাত) ওই কিশোরীরসহ দুজনকে হত্যার পর তাদের মরদেহ পুড়িয়ে দেন সম্রাট। পরদিন রোববার দুপুরের পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে খুনের সঙ্গে সম্রাটের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে রোববার সন্ধ্যায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। সোমবার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি ছয় খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
হেলাল উদ্দিন বলেন, ভবঘুরে ওই সিরিয়াল কিলার দিনের বেলায় থানার আশপাশে ঘোরাফেরা করলেও গভীর রাতে তার দেখা মিলত ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক বা ওভারব্রীজে। যেসব ভবঘুরে বা পাগল নারী রাতে ওভারব্রীজে ঘুমাতেন, তাদের কাউকে কাউকে ফুসলিয়ে তিনি পৌর কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে আসতেন। যারা তার কথায় কমিউনিটি সেন্টারে আসতেন, তারাই খুনের শিকার হতেন।
জানতে চাইলে সাভার থানার তদন্ত অফিসার আরও বলেন, খুনি ধরা পড়েছেন এবং খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছেন। এখন ভিকটিম অর্থাৎ যারা খুন হয়েছেন, তাদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে।
হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, শুধু এই ছয় খুনই নয়, সম্রাট আরও কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তদন্ত চলছে। আশা করি, সব তথ্য বের হয়ে আসবে।
সিরিয়াল কিলার সম্রাটের পরিচয়
সাভার মডেল থানা পুলিশ জানায়, সাভারে ছয় জনকে নৃশংস কায়দায় হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সিরিয়াল কিলার সম্রাটের প্রকৃত নাম সবুজ শেখ। তার বাবার নাম পান্না শেখ। তারা তিন ভাই, চার বোন। বড় বোন। দ্বিতীয় সবুজ শেখ। তারপর আরেক বোন ও আরেক ভাই। তারপর আরও দুই বোন। তাদের নানা বাড়ি বরিশালে। সবুজের জন্মস্থান এবং বাবার বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামে।
পুলিশের দাবি, নিজ পরিচয় গোপন করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভবঘুরে নারীদের পরিত্যক্ত ভবনের নির্জন স্থানে নিয়ে আসতেন সিরিয়াল কিলার সম্রাট। কিন্তু তারা অন্য কারো সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদেরকে হত্যা করত। সর্বশেষ ঘটনার ৩-৪ দিন আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে কমিউনিটি সেন্টারে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতালায় নিয়ে মেরে ফেলে সম্রাট। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে। তারপরে মরদেহ পুড়িয়ে দেয়।
