২০২৬ সালে কেমন বাংলাদেশ চান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

রুশাইদ আহমেদ: বেরোবি প্রতিনিধি

সময়ের পরিক্রমায় অবশেষে বিদায় নিলো ২০২৫। বছরজুড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উত্থান-পতন, রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত, বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের হিড়িকে সরগরম ছিল গোটা আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের বিস্তৃত অঙ্গণ।

আদতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে প্রায় দেড় বছর ধরে অন্তবর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করে আসছে। নতুন শুরু হওয়া ইংরেজি বছর ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন৷

এমতাবস্থায়, নতুন বছরের প্রারম্ভে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও উচ্চশিক্ষার বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নিয়ে নিজেদের ভাবনা ও প্রত্যাশার নানা কথা উল্লেখ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। নিম্নে তাদের ভাবনাগুলো তুলে ধরা হলো।

ছাব্বিশে স্থিতিশীলতা আসুক এটাই প্রথম চাওয়া

রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাজমুস সাঈদ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই শিক্ষার্থীর মতে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকা রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশের অবসান হওয়াটাই ২০২৬ সালে সকলেরই প্রথম চাওয়া।

সাঈদ বলেন, চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে উল্লেখযোগ্য হারে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও পলিটিক্যাল টার্মোয়েল (বা রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্ত) এখনও চলছে। বিশেষ করে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে প্রশাসনিক দায়িত্ব অদলবদল এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব লোপ পায়নি পুরোপুরিভাবে। এমতাবস্থায়, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন সব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারবে বলে শোনা যাচ্ছে। সময়ই বলে দেবে কী হবে।

বিগত সরকারের আমলে বিদেশে বিপুল আকারের অর্থ পাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বেশ চাপের ভেতর আছে৷ অনেক অর্থ পাচার হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির বিষয়ও আছে৷ সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও জোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অধিকার নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সিরামিক অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহাফুজ আলম মনে করেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

মাহাফুজ বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণের ফলে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া রাষ্ট্রের চরিত্রকে যদি ইনসাফের নিরিখে গড়ে তোলা যায়, তবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে। ভিন্নমত দমন ও জবাবহীনতার সংকট কেটে উঠবে। এতে করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রথাগত “প্রতিশ্রুতির রাজনীতি”-র সমালোচনা করে মাহাফুজ বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেকারত্ব ও বৈষম্য মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতির রাজনীতির বদলে শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে, বাস্তবমুখী কাঠামোগত সংস্কার সাধন করে উন্নয়নের ভাষা আর বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব হ্রাসের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

একইসঙ্গে, হল দখলের “পাঁয়তারা”, ছাত্রসংগঠনসমূহের শক্তি প্রদর্শননির্ভর কার্যক্রম ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার কারখানায় পরিণত করার দাবি জানান তিনি।

নতুন বাংলাদেশের সূচনা দেখার প্রতীক্ষায়

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী সামিহা ফেরদৌসীর ভাষায়, দেড় বছর ধরে বাংলাদেশ একটি “তালগোলের সময়” পার করে এলেও ২০২৬ সালের প্রারম্ভে নতুন বাংলাদেশের সূচনা দেখার প্রতীক্ষায় প্রহর গুণছেন দেশবাসী।

সামিহা বলেন, ’২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে প্রায় দেড় বছর যাবৎ বলতে গেলে দেশে একটা টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তাই নতুন বছরে একটা সুন্দর নতুন বাংলাদেশের সূচনা হওয়া উচিত, যেখানে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা নির্বিঘ্নে অব্যাহত থাকবে। বিগত সময়ের মতো কোনো ফ্যাসিবাদ আমাদের মাথার ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারবে না।

একইসঙ্গে, আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নয়নেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সুসংহত করার লক্ষ্যে যাঁরা পলিসিমেকার আছেন, তাঁদের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি প্রণীত নীতি ও বিধিবিধান মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি-না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নজরদারি বহাল রাখার দাবি জানান সামিহা।

২০২৬ হোক আলোকিত সম্ভাবনার বছর

নানা সংকট ও উদ্বেগ কাটিয়ে নতুন বছর আলোকিত ও নব সম্ভাবনার বছর হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করেন ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহাবুবা আক্তার শান্তি।

শান্তি বলেন, গেল বছরের নানা সংকট ও উদ্বেগ পেরিয়ে আমরা পা রাখলাম ২০২৬ সালে। নানা সংগ্রাম, প্রতিবাদ, আন্দোলন পেরিয়ে নতুন সূর্যোদয়ের আগমন যেন ঘটলো। ’২৪ এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিক্রমায় ডাকসু, চাকসু, জাকসু ও রাকসু নির্বাচনসহ নানা ঘূর্ণাবর্তে ২০২৫ কেটে গেলেও সকল চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০২৬ সাল আলোকিত, সফল, সম্ভবানাময় হয়ে উঠবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

২০২৬ সালকে হতে হবে আরও মানবিক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. নিয়াজ মাখদুম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইনকিলাব মঞ্চের গণমাধ্যম ও প্রচার বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত—এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। গত কয়েক বছরের সরকার দলীয় ছাত্ররাজনীতির গ্রুপিং, বিভিন্ন উপগ্রুপের সংঘর্ষ ও হল দখলের মতো “ন্যাক্কারজনক ঘটনা” দেশের ক্যাম্পাসগুলোর শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করার পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে বলে মনে করেন নিয়াজ।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সবচেয়ে বড় ও নীরব যে সংকটটি রয়ে গেছে, তা হলো শিক্ষক রাজনীতি। এটিই আজ একাডেমিক নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতাকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করছে। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা শিক্ষকদের ন্যায্যতা ক্ষুণ্ন করছে। আপসের সংস্কৃতি তৈরি করছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষা, গবেষণা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের জন্য নির্দলীয় থাকা একাডেমিক এক্সিলেন্সের মৌলিক শর্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একইভাবে, নতুন ইংরেজি বছর নিয়ে নিজের দেখা স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে নিয়াজ মাখদুম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে ইনসাফের কথা বলা হচ্ছে, সেটাকে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক পরিক্ষেত্রসমূহে প্রতিষ্ঠা করা এখন সবচেয়ে জরুরি। ২০২৬ সালকে আরও মানবিক, সুশৃঙ্খল একটা বছরে পরিণত করতে এর কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মানুষ যে বদল চায়—সে দিকে নজর দিতে হবে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী
খোন্দকার রিয়াসাত ইসলাম অমিয়-এর বিশ্বাস, ২০২৬ সাল নিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নানা রকমের দোলাচল থাকলেও, তাঁরা আসলে বিগত “ঘুণেধরা” ব্যবস্থার বদল চান।

অমিয় বলেন, ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে ক্লান্ত দেখালেও, এটি একেবারে নিস্তেজ নয়। গত এক বছরে রাজনীতি, অর্থনীতি আর সমাজ—সবকিছু মিলিয়ে মানুষ যেন প্রতিদিন নতুন এক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সামনে নির্বাচন, তাই চারদিকে কেমন একটা অস্থিরতা, আলোচনা আর অপেক্ষা কাজ করছে। মানুষ আর আগের মতো চুপচাপ নেই; অধিকার, জবাবদিহিতা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন এখন ঘরের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে।

দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই খাতে চাপটা সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া গেছে দৈনন্দিন জীবনে। বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে, মানুষের আয় বাড়েনি। চাকরি পাওয়া কঠিন হয়েছে, ব্যবসায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত—সবাই হিসাব কষে দিন চালাচ্ছে। রেমিটেন্স আর রপ্তানি কিছুটা ভরসা জোগালেও সাধারণ মানুষের জীবনে সেই স্বস্তি ঠিকভাবে পৌঁছায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শিক্ষাঙ্গণের পরিস্থিতি নিয়ে অমিয় বলেন, দেড় বছর ধরে কখনো ক্লাস বন্ধ রয়েছে, কখনো আন্দোলনের ফাঁকে ফাঁকে অনিয়মিতভাবে ক্লাস হয়েছে। কারণ শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেছে। ক্যাম্পাসগুলো এ সময় অস্থির থাকলেও, সেখানে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়েছে, যা আগে এতটা চোখে পড়েনি।

তাঁর ভাষায়, এই সব উত্থান-পতন, ক্ষোভ আর আশা নিয়েই বাংলাদেশ ২০২৬-এর দিকে হাঁটছে। বছরটা কী দেবে, সেটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট—মানুষ বদল চায়, আর সেই চাওয়াটা আর আগের মতো চাপা পড়ে নেই তাদের হৃদয়ের গহীনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *