ভুয়া হিসাব কর্মকর্তা সেজে নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের অর্থ আত্মসাৎ

মোঃ তৌফিকুল ইসলাম
নোবিপ্রবি প্রতিনিধি

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে অভিনব কায়দায় প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, একটি প্রতারক চক্র বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে ব্যক্তিগত ও ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ফেসবুক পোস্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতারকরা প্রথমে ফোন করে জানায়-শিক্ষার্থী মেধাবৃত্তি অথবা বিশেষ শিক্ষাবৃত্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ সময় তারা শিক্ষার্থীদের নাম, রোল নম্বর, বিভাগ এমনকি পরিবারের সদস্যদের তথ্যও নির্ভুলভাবে উল্লেখ করে, যা শিক্ষার্থীদের সন্দেহ কমিয়ে দেয়।
এরপর টাকা পাঠানোর অজুহাতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য জানতে চাওয়া হয়। পরে ভেরিফিকেশনের নামে ওটিপি পাঠিয়ে সেটি জানতে চাইলে অনেক শিক্ষার্থী বিভ্রান্ত হয়ে তা প্রদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওটিপি দেওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয়েছে।
আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুবদী রাফিন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে জানান, প্রতারকরা এমনভাবে কথা বলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ লোক ছাড়া এত তথ্য জানার কথা নয়। এমনকি তারা অভিভাবকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের বিকল্প প্রস্তাবও দেয়, যা ঘটনাটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
আইসিই বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান তার পোস্টে জানান, সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো-অগ্রণী ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে তারা তার বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়। এতে বোঝা যায়, শিক্ষার্থী না পেলে অভিভাবকদের টার্গেট করেই অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “আমার বাবা-মায়ের নাম জানাটা হয়তো সম্ভব। কিন্তু আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রণী ব্যাংক শাখায় অ্যাকাউন্টধারী-এ তথ্য থার্ড পার্টির জানার কথা নয়।”
এসিসিই বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী তৈবুর রহমান রাফি জানান, তিনি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হওয়ায় বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। হিসাব কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে সরকারি বৃত্তির কথা বলে মাস্টার কার্ড নম্বর জানতে চাওয়া হয়। চাপের মুখে তিনি বন্ধুর মায়ের কার্ড নম্বর দেন এবং ওটিপি প্রদান করলে সঙ্গে সঙ্গে দশ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হয়।
পরে আরও অ্যাকাউন্ট চাইলে তার সন্দেহ হয় এবং খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন-বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো কর্মকর্তা নেই এবং কোনো ধরনের আর্থিক তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রমও চলমান নয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার(ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ তামজিদ হোসেন চৌধুরী বলেন, “এগুলো হ্যাকারদের কাজ। একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। আমরা অভিযোগ পেয়েছি এবং সবাইকে সতর্ক করছি—এ ধরনের নম্বর থেকে যোগাযোগ করা হলে যেন কেউ লেনদেন বা তথ্য শেয়ার না করে। শিগগিরই একটি সতর্কতামূলক নোটিশ প্রকাশ করা হবে।”

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন,
“আমাদের কাছে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা পুলিশ অথবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জানাতে পারবেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধুমাত্র সাধারণ তথ্য জানার মাধ্যমে এত নিখুঁতভাবে প্রতারণা চালানো সম্ভব নয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইসিটি সেল ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা। দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা, তথ্য ফাঁসের উৎস শনাক্ত করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
তাদের ভাষ্য, প্রশাসনের স্পষ্ট উদ্যোগ ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ করা সম্ভব নয়। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও শিক্ষার্থী ও অভিভাবক একই ধরনের সাইবার প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *